
কখন কোথায় কীভাবে ইতিহাসে নতুন মোড় ফেরা তৈরি হয়, সেটা জ্যোতিষীর মতো কেউ কাল গণনা করে বলে দিতে পারে না, কিংবা কোনো রাষ্ট্রবিদ যুগ-লক্ষণ বিবেচনা করে আগাম বার্তা দিতে পারে না। অন্যদিকে ইতিহাসে অনেক অঘটনও ঘটে, আকস্মিক কোনো ছোট ঘটনা থেকে জন্ম নেয় বড় রকম অভিঘাত। একটি ঘটনা ডেকে আনে অনেক দুর্ঘটনা, চেনা পরিচিত বাস্তবতা পাল্টে যায় বিপুলভাবে। তেমনি এক ঐতিহাসিক বিভ্রম, ধোঁয়াশা ও হতবুদ্ধিকর পটভূমিতে ভারত ভাগ করে জন্ম নেয় পাকিস্তান, কেমন হবে সেই রাষ্ট্রের রূপ, কী হবে তার সীমানা, যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এমন রাষ্ট্রের দাবি তোলা হয়েছিল।
সেই দর্শনের স্বরূপ কী এবং তার ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রের কাঠামো ও পরিচালনা পদ্ধতি কোন ধরনের হবে, সে সম্পর্কে যারা এই রাষ্ট্রের প্রবক্তা তাদেরও কোনো পূর্বধারণা ছিল না। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’–এমন এক উন্মাদনায় মানুষকে সমবেত করা গেলেও সেই মানুষদের মধ্যে রাজনৈতিক বোধ সঞ্চার ও একই লক্ষ্যে তাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা বিশেষ ছিল না। সোনার পাথরবাটির মতো এক অলীক বস্তুকে বাস্তব নাম-পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, সে-পরিচয়েও ছিল বিভ্রম। ১৯৪০ সালের যে লাহোর প্রস্তাবকে বলা হয় ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’, সেই দলিলে পাকিস্তান শব্দের দেখা মেলে না, বরং উল্লেখ ছিল ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পৃথক পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ শতকের সূচনার্ধে ইউরোপের মানচিত্রে পরিবর্তন এসেছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ও অটোম্যান খেলাফতের অবসানে, আবির্ভূত হয়েছিল বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্র। অন্যদিকে ১৯১৭ সালের অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিশাল বহুমাত্রিক রুশ সাম্রাজ্যে স্ব-শাসিত অঙ্গরাজ্যের সমন্বয়ে জন্ম দিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক সংঘ। তবে কতক ইউরোপীয় দেশ কর্তৃক পদানত এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ তখনও স্বাধীনতা লাভ করেনি। ডিকলোনাইজেশন তখনও দূর-অস্ত, তবে এটা বোঝা যাচ্ছিল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মোচন করে স্বাধীনতার পথে প্রথম পা বাড়াবে ভারতবর্ষ, ভারতের জনগণের মুক্তি আন্দোলন, নানা সমস্যায় আকীর্ণ হলেও পদানত জাতিগুলোর মুক্তি আন্দোলনে হয়ে উঠেছিল পথপ্রদর্শক ও প্রেরণা।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর
যখন ব্রিটিশ শাসনের অবসান অবধারিত হয়ে উঠল, তখন ব্রিটিশ শাসকদের প্রিয় নীতি
ডিভাইড অ্যান্ড রুলের জের বহন করে, স্বাধীন ভারতের জন্য বিভিন্ন
রাষ্ট্রকাঠামো সন্ধান করা হচ্ছিল। এই সূত্রেই আলোচনায় স্থান পায় কেবিনেট
মিশন পরিকল্পনা, যা ফেডারেল ভারতে তিনটি পৃথক রাজ্য প্রতিষ্ঠার সুপারিশ
করে–পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিমপ্রধান অংশে দুটি পৃথক রাষ্ট্র এবং
অবশিষ্ট ভারতে একটি। এ ছাড়াও থাকছে কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, ত্রিপুরা, মণিপুরসহ
বিভিন্ন দেশীয় করদ রাজ্য এবং সম্মিলিতভাবে গঠিত হবে ফেডারেল ভারত, যেখানে
রাজ্যগুলো ভোগ করবে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন।
কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা নেহরু ও জিন্নাহ উভয়ে গ্রহণ করেছিলেন, যা
প্রদর্শন করে যে উপযুক্ত কাঠামোর আওতায় পাকিস্তান দাবি থেকে সরে আসতে
জিন্নাহ সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু নেহরু পরে মত বদল করলে জিন্নাহ
আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ পাকিস্তানের দাবিতে
ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালনের আহ্বান জানান। এই ডাইরেক্ট অ্যাকশন ব্রিটিশের
বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল কার বিরুদ্ধে সেটা জিন্নাহ খোলাসা না করলেও অনুসারীরা
যে বার্তা পেয়েছিল তা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরও তিক্ত ও উত্তেজনাকর করে
তোলে।
সেদিন কলকাতাজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা, যা পরিচিতি পায় গ্রেট ক্যালকাটা
কিলিং হিসেবে, রক্তগঙ্গা বয়ে যায় শহরজুড়ে। এরপর দাঙ্গা ছড়িয়ে যায়
নোয়াখালীতে এবং পরে বিহারে। এই ডামাডোল পাকিস্তান দাবিকে আরও জোরদার করে।
তবে তখনও হিন্দু-মুসলিম মিলন ও যৌথতার ভিত্তিতে বিকল্প পথ খোঁজার মতো
নেতৃত্বও ছিল, যার প্রকাশ ঘটে বাংলার মুসলিম লীগের পক্ষে হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম এবং কংগ্রেসের পক্ষে শরৎ বসু ও কিরণশঙ্কর রায়
অখণ্ড স্বাধীন বাংলার পক্ষে যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেন।
রাজনীতির আবর্তে এই প্রস্তাবনা হালে পানি পায়নি, তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা যে অনিবার্য ছিল না, এসব ঘটনা সেটা দেখিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে দূর ভবিষ্যতে বাঙালি, খণ্ডিতভাবে হলেও, হিন্দু- মুসলিম মিলনে যে জাতিরাষ্ট্র গঠন করবে তার ছায়াপাত যেন এখানে দৃষ্ট হয়।পাকিস্তান নিয়ে উন্মাদনার মধ্যে নবরাষ্ট্রের এক অমোচনীয় ঘাটতি কারও দৃষ্টি তেমনভাবে আকৃষ্ট করেনি কিংবা করলেও সেটা তারা উপেক্ষা করেছেন। ভারতের যে অঞ্চলগুলোর আদ্যাক্ষর নিয়ে পাকিস্তান নামকরণ করা হয়েছিল, সেখানে বেঙ্গল বা বাংলার কোনো স্থান ছিল না।
অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর রূঢ় ও
অনতিক্রম্য ভৌগোলিক দূরত্ব কেউ বিশেষ ধর্তব্যের মধ্যে নেননি। ভারতেই দুই
প্রান্তের দুই ভৌগোলিক অংশ, যাদের মধ্যে ১২০০ মাইলের ফারাক, সেটা কীভাবে
একক রাষ্ট্র হিসেবে কার্যকর হতে পারে, তা কেউই তলিয়ে দেখেনি। বস্তুত
ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সদা কার্যকর ছিল, যা
চাইলেও কেউ পাল্টে দিতে পারে না।
ভূগোল তো বহির্বাস্তবতা, অন্যদিকে অন্তর্গতভাবেও পাকিস্তান বহন করছিল এক দ্বন্দ্ব। আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সোনার পাথর বাটি তৈরির অসারতা মেলে ধরে। পাকিস্তান দাবির যৌক্তিকতা হিসেবে জিন্নাহ হাজির করেছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্ব, যার মূলকথা হলো মুসলমানরা এক জাতি এবং এই জাতিসত্তায় ভারতীয় মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ, তাদের প্রয়োজন নিজস্ব হোমল্যান্ড, মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি। মুসলিম জনতাকে উত্তেজিত করতে এমন বয়ান কার্যকর প্রমাণিত হলেও যখন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যাত্রা শুরু করল,
সেই মাহেন্দ্রক্ষণে জিন্নাহ উপলব্ধি করেছিলেন নাগরিকের সম-অধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্র দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে না। আর তাই ১১ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান গণপরিষদে গভর্নর জেনারেল হিসেবে জিন্নাহ যে ভাষণ দিলেন, সেটা বাস্তব বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন, আজ থেকে পাকিস্তানে মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, খ্রিষ্টান থাকবে না খ্রিষ্টান; তারা সবাই হবে পাকিস্তানি। প্রত্যেকে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করবে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সবাই হবে সমান, জিন্নাহর এমন বক্তব্য ছিল মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীত।
‘দ্য মিথ অব কনস্টিটিউশনালিজম ইন পাকিস্তান’ গ্রন্থে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানের প্রবর্তক গোষ্ঠীর রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে জুলফিকার খালিদ মালুকা লিখেছেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্র হবে মুসলমানদের, তবে অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে তাদের সংখ্যাগত গণনা অনুযায়ী অধিকার দেওয়া হবে, এই ছিল মূল চিন্তা। সেজন্য থাকবে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, কেননা অমুসলিমরা সর্বজনীন নির্বাচনে মূলধারার মুসলিম রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়ে নেতৃত্বে অনুপ্রবেশ করতে পারে।
জিন্নাহর আদি ভাষণ ও মুসলিম লীগের অবস্থান, উভয় বিচারে শেষাবধি পাকিস্তান দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষেই ছিল, জিন্নাহও তাঁর আদি ভাষণের পথে আর এগোননি, পাকিস্তান পরিণত হলো কর্তৃত্ববাদী ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রে, পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্র আধিপত্যবাদী রূপ গ্রহণ করে, যা কার্যত হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ। পাকিস্তানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাঙালির কোনো ভূমিকা ছিল না, পূর্বাঞ্চলের আহরিত সম্পদ চালান হতো পশ্চিমে, প্রশাসন ও সশস্ত্র শক্তি কাঠামোতে বাঙালির অংশভাগ ছিল গৌণ।
অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা ৫৬ শতাংশ নাগরিকের বসবাস। পাশাপাশি পূর্ব বাংলা ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি-সমাজচিন্তা ও সামাজিক সুষমতা বিচারে অনেক এগিয়ে। ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রামেও বাঙালির ছিল অগ্রণী ভূমিকা। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল প্রতাপশালী সামন্তবাদী সমাজ; বৃহৎ ভূস্বামী ও দরিদ্র কৃষকে বিভাজিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সমাজ। এই ভূস্বামী পরিবার থেকেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের সদস্য জোগান দেওয়া হতো। পাকিস্তান যাত্রাকালে পেয়েছিল দিল্লির ব্রিটিশ শাসনকেন্দ্রের সম্পদের ন্যায্য ভাগ।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বাংলা থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল, আর তাই ব্রিটিশ রাজ্যের সেনাভুক্তির নীতিমালা পাল্টে গিয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহের পর, বাংলা ও বিহার বিবেচিত হয়েছিল অবিশ্বস্ত হিসেবে, পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশ এবং পাহাড়ি জনজাতি নির্ভরযোগ্য হিসেবে গণ্য হয়েছিল, তারাই অগ্রাধিকার পেল সেনাসদস্য হতে। সিপাহি বিদ্রোহের সময় পাঞ্জাব বাহাদুর শাহ জাফরের পক্ষে যোগ দেয়নি, তাই বিদ্রোহ দমনের থেকে তারা রাজকীয় সেনাবাহিনীতে বংশানুক্রমে স্থান পেতে শুরু করল, এভাবে জন্ম নিল ‘যোদ্ধা জাতি’র মিথ বা মিথ্যা ধারণা।
অন্যদিক প্রশাসনেও ছিল বড় ভূস্বামী পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যাত্রা শুরু করল অবিভক্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক-চতুর্থাংশ সদস্য নিয়ে এবং সেই সঙ্গে ছিল বিশাল আমলাতন্ত্র। পক্ষান্তরে রাজধানী করাচি নির্ধারিত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠল এমন শহর, যেখানে বাঙালিদের উপস্থিতি কিংবা প্রবেশ লাভের সুযোগ ছিল সীমিত।
এহেন পাকিস্তান সংবিধান প্রণয়নে যে-যাত্রা শুরু করল, শুরুতেই তা হোঁচট খেয়েছিল পরিষদের ভাষা প্রসঙ্গে। ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব তো নাকচ হলোই, অধিকন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গর্জে উঠে বললেন যে, ‘উর্দু হচ্ছে ইসলামের ভাষা, এর বিপরীতে কিছু বলার অর্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’

বাংলা ভাষার অধিকার অস্বীকৃতির সেই অধিবেশনের কথা সুবিদিত। তবে এর আগের দিন আরেক প্রস্তাব নাকচ হয়েছিল। রাজকুমার চক্রবর্তী প্রস্তাব করেছিলেন যে পরিষদ অধিবেশন একবার করাচিতে এবং একবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হোক। এর সমর্থনে পূর্ব বাংলা থেকে মনোনীত সদস্য শায়েস্তা একরামউল্লাহ বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানে এই মানসিকতা গড়ে উঠছে যে পাকিস্তানে তাদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা হচ্ছে
এবং পূর্বাঞ্চলকে নিছক ‘কলোনি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সঠিক বা বেঠিক যাই হোক না কেন এমন মনোভাব দূর করার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে।” সেই চেষ্টা পাকিস্তান কখনও নেয়নি এবং পূর্ব পাকিস্তান বস্তুত পাকিস্তানের কলোনিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, যদিও বাহ্যত তা ছিল এক রাষ্ট্র, তবে এক দেশ যে ছিল না, সেটা আড়াল করা হয়েছিল নানা বুলির আড়ালে, ধর্ম যেখানে হয়েছিল প্রধান অবলম্বন।
পাকিস্তানের জটাজাল ছিন্ন করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় যে সহজ ঘটনা ছিল না, ইতিহাসের পরতে পরতে আমরা তার পরিচয় পাই। আলোকের পথে বাঙালির এই অভিযাত্রার পথচিহ্নগুলো আমাদের নানাভাবে খুঁজতে হবে, বুঝতে হবে। ইতিহাসের চালু বয়ানগুলোর আরও গভীরে প্রবেশ করে, আরও তলিয়ে এর নানা দিক বুঝতে হবে। যে সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক আবিলতা মুক্ত হয়ে বাংলার মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সকল মানুষের সম্মিলিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেল, তার তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী।
আমরা দেখছি কূপমণ্ডূক গোষ্ঠীবাদী চেতনা লালন করে যে পাকিস্তানের যাত্রা, তা আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, হানাহানি এখন ঘরের ভেতরে, মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের আঘাত, শিয়া-সুন্নি হানাহানি, আফগান-পাকিস্তান সংঘাত, ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করার প্রবণতা ভেতর থেকে দেশের অবক্ষয় ডেকে আনছে, যা ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি ও আরএসএসের উত্থানে প্রকাশ পাচ্ছে, সমাজে সম্প্রীতির স্থান দখল করে নিচ্ছে সংঘাত।
শ্রীলঙ্কায় জাতিগত সংঘাত রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছিল, মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের সঙ্গে সামরিক শাসকদের আঁতাত রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য খ্রিষ্টান জনজাতির জীবন বিপন্ন করে তুলছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সম্প্রীতির আদর্শ অবলম্বন করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার অবলম্বন হয়েছে, কেননা এই জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক ও নৃতাত্ত্বিক, চরিত্রগতভাবে অসাম্প্রদায়িক। এর শ্রেষ্ঠ প্রকাশ দেখি আন্দোলনরত মানুষের স্লোগানে,
‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’; নদী অববাহিকার এ-দেশের মানুষ নদীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, তাদের কারও পরিচয় পদ্মাপারের মানুষ, কারও-বা মেঘনাতীরের মানুষ হিসেবে। সেই মানুষ হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান যেই হোক, এই নদীতিলক তাতে মুছে যায় না। ‘আমি যত দূরেই যাই, আমার সঙ্গে যায় ঢেউয়ের মালা গাঁথা এক নদীর নাম’–সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই পঙ্ক্তি সেই পরিচিতিই তুলে ধরে।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিপুল আত্মদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হানাহানি-পীড়িত উপমহাদেশ ও বৃহত্তর বিশ্বের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বহন করে। অনেক মূল্যে কেনা এই স্বাধীন বাংলাকে আমরা যেন অল্পে খুইয়ে না বসি। মুক্তির স্বপ্নবহ বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আগামীর পথে সম্প্রীতির পতাকা হাতে, সেটাই আমাদের কাম্য।