পুরানা পল্টন, ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

যমুনা ঘিরে দিনভর উত্তেজনা, তুলকালাম

author
Reporter

প্রকাশিত : Feb 7, 2026 ইং
ad728

যমুনা ঘিরে দিনভর উত্তেজনা, তুলকালাম


মোঃ মনিরুল ইসলাম: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার ও সরকারি চাকরিতে নবম পে-স্কেলের গেজেট জারির দাবিতে গতকাল দিনভর উত্তাল ছিল প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ এলাকা। বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে সরাতে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত দফায় দফায় লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগ, বাংলামোটর, কাওরান বাজার মোড়, ইস্কাটন থেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটডোর পর্যন্ত এলাকায় পুলিশ-বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ ছড়ায়। তুলকালাম পরিস্থিতিতে পুরো এলাকা জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করে। পুলিশ-বিক্ষোভকারীসহ অন্তত অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন। সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ ছেড়ে যান আন্দোলনকারীরা। আজ সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আব্দুল্লাহ আল জাবের।নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হঠাৎ এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। হঠাৎ এই আন্দোলনের পেছনে কোনো পক্ষ কলকাটি নাড়ছে কিনা এ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।


নবম পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়নের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে যমুনা অভিমুখে রওনা করেন। তবে তাদের পথরোধ করতে আগে থেকেই শাহবাগ থানার সামনে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে পুলিশ। সেই ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগুতে থাকলে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান থেকে রঙিন পানি নিক্ষেপ করে পুলিশ। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় হয়ে যমুনার সামনে পৌঁছে যায়। বেলা ১১টার দিকে যমুনার ঠিক সামনের রাস্তায় বসে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় পুরো এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ডিএমপি কমিশনার থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিজিবি, এপিবিএন, সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। প্রথমে আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানায় পুলিশ। তবে তারা সরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। বহু চেষ্টার পরও বিক্ষোভকারীরা যমুনা এলাকা না ছাড়লে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। একইসঙ্গে জলকামান থেকে রঙিন পানি ছিটানো শুরু করে। এরপরই একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। পুলিশের তোপের মুখে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ রমনা পার্কের মধ্যে ঢুকে পড়েন। কেউ আবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের দিকে দৌড়ে সরে যান। এভাবে দফায় দফায় চলে ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ। সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের মুখে টিকতে না পেরে একপর্যায়ে শাহবাগ ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটডোরের গলি হয়ে শহীদ মিনারের দিকে চলে যান। আহতদের নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।


এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জাতিসংঘের মাধ্যমে পুনঃতদন্ত ও হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে যমুনার অদূরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে গত বৃহস্পতিবার থেকেই অবস্থান নিয়ে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা। তাদের সঙ্গে সেখানে অবস্থানে ছিলেন ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের মূল সড়কে তাঁবু পেতে ও কম্বল গায়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতভর অবস্থানের পর শুক্রবার সকালেও তারা সেখানেই অবস্থান নিয়ে ছিলেন। আন্দোলনরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যাওয়ার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরাও মাইক নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এরই মধ্যে তাদের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে যমুনায় যায়। এ সময় রাস্তায় অবস্থান নেয়া ইনকিলাব মঞ্চের সকলকে পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রাখা হয়। পুলিশের সঙ্গে এই সময় বিজিবি, এপিবিএনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও বেশ কয়েকটি সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে না পেরে যমুনা থেকে প্রতিনিধিদল ফেরত এলে অবস্থান নেয়া ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। এই সময় তারা পুলিশকে ব্যারিকেড খুলে রাস্তা ছেড়ে দিতে ১০ মিনিট সময় বেঁধে দেন। কিন্তু সেখানে আরও অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়। এরপর ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার দিকে এগুতে থাকেন। তখন পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে রঙিন পানি ছোড়ে। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা। পুলিশও ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে। এ সময় পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা।


ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের লক্ষ্য করে একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। পুলিশের তোপের মুখে টিকতে না পেরে আশে পাশের অলিগলি ও ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশ সেখানে গিয়েও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের পাকড়াও করে। এসময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও মারধর করে পুলিশ। হোটেল কন্টিনেন্টাল মোড় থেকে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দিয়ে ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বাংলামোটর হয়ে কাওরান বাজার মোড় পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। উল্টো দিকে শাহবাগ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গলি দিয়ে পাঠক সমাবেশের সামনে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের, রাকসুর জিএস আম্মারসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর আবরো শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয় ইনকিলাব মঞ্চের সমর্থকেরা। তাদের সঙ্গে আবারো বিবাদে জড়ায় পুলিশ। শাহবাগ থেকে কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।

এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে এবং একপর্যায়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের গুলি ছোড়েনি। পুলিশ সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও আইনানুগভাবে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে। 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Reporter

কমেন্ট বক্স
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক আমার প্রেরণা ডট কম
সকল কারিগরী সহযোগিতায় A2SYS