চলতি সপ্তাহের শেষে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রমজান এলেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে মতবিনিময়সহ নানা পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচনের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। নতুন সরকারকেই সম্ভবত শুরুতে রমজানের বাজারের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ জেলা প্রশাসনকে তাগাদা পত্র প্রদান করা হয়, যাতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সভা আয়োজনের সংবাদ দেখা যায়। সভাগুলো অনেকেই আনুষ্ঠানিকতা বললেও ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বা তাদের আন্তরিকতার বহির্প্রকাশের লক্ষণ দৃশ্যমান ছিল না বলে অনেকেই মতপ্রকাশ করেছেন।
অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই আবার বিষয়টি অনেকটাই লোক দেখানো বলেই অভিমত প্রকাশ করেছেন। কারণ রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার তদারকিতে প্রশাসন কি উদ্যোগ নেবে? ব্যবসায়ী ও সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কি সহযোগিতা আশা করেন– সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি বলে জানান।
মজার বিষয় হলো সব জায়গায় ব্যবসায়ীরা একটি কথা জোরেশোরে উচ্চারণ করেছেন, সেটা হলো– ‘বাজার তদারকির নামে ব্যবসায়ীদের যেন হয়রানি করা না হয়।’ কথাগুলো প্রশাসনের লোকজন খুবই গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন এবং এর আগেও তারা বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্বসহকারে নিয়ে থাকেন। কারণ বিগত সরকারগুলোতেও ব্যবসায়ীর আধিক্য ছিল। ব্যবসায়ী ও সেবা প্রদানকারীরা যদি আইন, বিধি, নিয়মকানুন মেনে ব্যবসা করে থাকেন, তাহলে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।
আবার জেলা প্রশাসন, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বাজার তদারকি সংস্থাগুলো সরেজমিন তদারকিতে গেলেই দেখা যায় ব্যবসায়ী নামক কিছু মূল্য সন্ত্রাসী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা ফন্দিফিকিরে মানুষের পকেট কাটেন, ভোক্তাদের মানহীন ভেজাল পণ্য ও খাবার দেন। ক্রেতা-ভোক্তাদের নানাভাবে প্রতারিত করার লোমহর্ষক প্রতিবেদন ও তথ্য গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। এসব ঘটনা আমাদের সবার কাছে জানা।
পবিত্র মাহে রমজানে যেসব পণ্য বেশি ব্যবহার হয়, তার মধ্যে ছোলা, সয়াবিন, খেজুর, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, পেঁয়াজ, লেবু, শসা, কাঁচামরিচ, বেগুন, আমদানি করাসহ নানা পণ্য যেগুলোর দাম রমজানের আগে স্বাভাবিক থাকলেও রমজানের ১-২ দিন আগে আকাশচুম্বী হয়ে যায়। যেখানে শসা ১২০ টাকা কেজি, কাঁচামরিচ মার্কেট উধাও হয়ে যাওয়া ও দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও ব্যবসায়ীরা এগুলোকে স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেন।
আবার দেশীয় পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, শাড়ি, কসমেটিকস, জুতা বিদেশি স্টিকার লাগিয়ে এক হাজার টাকার পণ্য ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করার ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। ঢাকার চকবাজারের নকল কসমেটিকস বিদেশি স্টিকার লাগিয়ে আমদানি বলে চালিয়ে দিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে মানুষের পকেট কাটছেন। আর বাজার তদারকিতে ধরা পড়লেই হয়রানি বলে চালিয়ে দেন।
ঠিক একইভাবে সরকার বিভিন্ন সময় দেশের ভোক্তাদের স্বার্থ চিন্তা করে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ নানা কর রেয়াতি সুবিধা প্রদান করলেও ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে ও বেশি দামে আমদানিসহ নানা অজুহাতে সরকারের এই বিশাল কর রেয়াতি সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে আসতে দেন না।
পুরো সুবিধা তারা নিয়ে নেন। আপত্তি শুধু যখন বাজার তদারকি টিমের কাছে ধরা পড়ে, তখনই বিপত্তি। যে কারণে গত বছর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এক আমদানিকারকের দোকানে অভিযান পরিচালনাকালে জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেখলেন, এক হাজার ২০০ টাকা দামে আমদানি করা এলাচ বিক্রি করছে চার হাজার ৩০০ টাকায়। যদিও আমদানির এলসি ও কাস্টমের তথ্য মেলানো হলেই আসল তথ্য বেরিয়ে আসে।
রমজানে বেশি ব্যবহার্য ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপ। কাস্টমস, বন্দর ও আমদানিকারকদের তথ্যমতে রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত। ফলে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, জ্বালানি সংকট, চাঁদাবাজি, বন্দরে ধর্মঘট ও বাজারে প্রশাসনিক তদারকির অভাবে পণ্যের দামে প্রতিবারের মতো কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বড় আমদানিকারক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সার্বিক সহায়তা ও নজরদারি প্রয়োজন।
পবিত্র মাহে রমজান, মুসলিম বিশ্বে আসে নাজাতের মাস হয়ে। আর আমাদের দেশে আসে মুনাফার মাস হয়ে। ব্যবসায়ীরা রমজানে এক মাস ব্যবসা করবে, ১১ মাস বসে থাকবে। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে রমজানের সময় মূল্যছাড়সহ নানা উদ্যোগ থাকলেও আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা পুরো বছরের লাভ রমজানে তুলে নিয়ে নিজেরা রাজনৈতিক দলের বড় অনুদান দাতা, দানবীর, সাদা মনের মানুষ ইত্যাদি সাজার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।
অথচ রমজানে তারা যদি ভোক্তাদের প্রতি সদয় হন, তাহলে রোজাদাররা স্বস্তিতে রমজানে রোজা পালন, ইবাদত-বন্দেগি ও উপাসনা পালন করতে পারেন। যার জন্য রোজাদারদের দোয়াও তারা পাবেন। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে দায়িত্বরত প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন যারা বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তারাও যদি কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারাও কিন্তু সেই অপকর্মের ভাগীদার হবেন।
বিষয়টি অনুধাবন করে কারও
প্রতি সদয় বা বিভাজন না করে যথাযথভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করলেই সমাজে
ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে, সাধারণ মানুষ পবিত্র মাহে রমজানে স্বস্তিতে রোজা
পালন ও ইবাদত-বন্দেগি করতে পারবেন । এস এম নাজের হোসাইন: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।